ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট নিয়ে আমি কেন উদ্বিগ্ন?

Dr. Zaki Rezwana Anwar FRSA
৯ই নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন একটি ভ্যারিয়েন্ট [B.1.1.529] সনাক্ত করেছে যেটি বিশ্ব বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে বেশ কয়েকটি কারণে। প্রথমত: শুধুমাত্র স্পাইক প্রোটিনেই এর ৩০টিরও বেশী মিউটেশন হয়েছে; দ্বিতীয়ত: স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশনগুলোর  মধ্যে কয়েকটি বিশেষ বিশেষ মিউটেশন হয়েছে যা খুবই উদ্বেগের কারণ; তৃতীয়ত: এই ভ্যারিয়েন্টটি আগের যে কোনো ভ্যারিয়েন্টের চাইতে দ্রুত ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের নাম দিয়েছে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট।
কতটা দ্রুত এই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটি সংক্রমিত হতে পারে তার একটা ধারণা দিয়ে রাখি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওমিক্রন সনাক্ত হয়েছে নভেম্বরের ৯ তারিখে আর এরই মধ্যে বাতসোয়ানা, হংকং ও বেলজিয়ামে তা ছড়িয়ে পড়েছে। বেলজিয়ামে যে যাত্রীর দেহে ওমিক্রন সনাক্ত  হয়েছে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসেন নি, তিনি এসেছেন ইজিপ্ট থেকে এবং তিনি বেলজিয়ামে এসেছেন ১১ই নভেম্বরে। অর্থাৎ মাত্র কয়েকদিনেই অফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে একেবারে উত্তর পূর্বের দেশ ইজিপ্টে ছড়িয়ে গিয়েছে এই ভ্যারিয়্যান্ট। আমি এই কলামটি লিখতে লিখতেই বৃটেনে দু’জন সনাক্ত হয়েছে।
 এখন সব চাইতে জরুরী প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমানে প্রচলিত ভ্যাকসিনগুলো কি ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ করবে? ঠিক এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেও। কিন্তু পরে দেখা গিয়েছিল যে বৃটেনে যে ভ্যাকসিনগুলো দেওয়া হচ্ছে সেগুলো ডেল্টার বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে এতগুলো মিউটেশন হয় নি।
আমরা প্রতিনিয়তই মিউটেশনের কথা শুনছি এবং নিত্য নতুন ভ্যারিয়েন্টের কথাও শুনছি। তাহলে এই ওমিক্রন নিয়ে কেন আমার এত উদ্বেগ? এই উদ্বেগ কি কেবল বহু সংখ্যক মিউটেশন হওয়াতে? শুধুমাত্র মিউটেশনের  সংখ্যাই এখানে সব কথা নয়। এখানে যে মিউটেশনগুলো হয়েছে তা অতীতের চারটি ভ্যারিয়েন্ট অফ কনসার্নের মিউটেশনগুলোর সমষ্টি নিয়ে একটি প্যাকেজ মিউটেশন হয়েছে বলা যায়। বর্তমান ভ্যাকসিনগুলো ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ করে কিনা তা জানতে আমাদের এখন থেকে ২/৩ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। তবে ওমিক্রন আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে পাশ কাটিয়ে আমাদেরকে সংক্রমিত করার
যে শঙ্কা – তা হয়তো সত্যি হতে পারে, তবে বর্তমান ভ্যাকসিনগুলো গুরুতর অসুস্থতা ঠেকায় কিনা সেটিও জানা যাবে দু’এক সপ্তাহের মধ্যে।
মনে রাখতে হবে যখনই কোনো ভ্যারিয়েন্ট সনাক্ত হয় তখন তার অন্ততঃ কয়েক সপ্তাহ আগেই সেটি ছড়াতে শুরু করে (সংক্রমণের হারের উপর নির্ভর ক’রে), অর্থাৎ আমরা সব সময়ই কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে থাকি। কথা হচ্ছে এই ভ্যারিয়েন্ট কি ইমিউন সিস্টেমকে বাইপাস করতে পারে? ওমিক্রনে যে মিউটেশনগুলো হয়েছে তার মধ্যে তিনটি গুরুত্বপুর্ন মিউটেশন হচ্ছে E484A, K417N ও N440K – যে মিউটেশনগুলো  এন্টবডি দ্বারা কাবু না হতে ভাইরাসকে সাহায্য করে।
 নতুন ভ্যারিয়েন্টের উপর গবেষণা করার জন্যে ঐ ভ্যারিয়েন্টের মলিকিউলার ব্লুপ্রিন্টটি প্রয়োজন।  দক্ষিণ আফ্রিকার চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন। প্রাথমিক ড্যাটা বিশ্লেষণ করে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ধারণা করা যাবে যে ওমিক্রনের বিরুদ্ধে  বর্তমান ভ্যাটকসিনগুলো কাজ করে কিনা। আমি এ ব্যাপারে আশাবাদী হতে চাই তবে মিউটেশনের ধরন দেখে খুব আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। আমার ধারনা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে ভ্যারিয়েন্ট ছড়াতে  যেখানে মাস লাগতো ওমিক্রনের ক্ষেত্রে তা হবে দিন অথবা সপ্তাহের ব্যাপার! এরই মধ্যে প্রাথমিক ড্যাটা বিশ্লেষণ করে আমরা ইঙ্গিত পাচ্ছি যে ওমিক্রন রিইনফেকশন ঘটাবার ক্ষমতা রাখে, অর্থাৎ আগে যাদের কভিড হয়ে গেছে তাঁরা ঝুঁকিমুক্ত হয়তো হবেন না।
এবার বিজ্ঞানীরা ও সরকার প্রধানরা আগের যে কোনো ভ্যারিয়েন্টের‌ চাইতে অনেক দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং বৃটেন ও বহু দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা  সহ বেশ কয়েকটি দেশের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো যাবে – এমনটি ভাবা যায় না, তবে এটি সংক্রমণ একটু বিলম্বিত করার চেষ্টা মাত্র।
শুধু তাই নয়, এবার ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোও তাদের নতুন ভ্যাকসিন উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে এরই মধ্যে। মডের্না ইতোমধ্যেই ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ করে এমন বুষ্টার ভ্যাকসিন তৈরীর কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফাইজার ও জনসন এন্ড জনসনও একই পথ অনুসরণ করছে। এই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট এত দ্রুত সংক্রমণ ঘটায় যে যদি দেখা যায় বর্তমান ভ্যাকসিনগুলো ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ না করে এবং যদি ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তড়িৎ গতিতে আগের ভ্যাকসিনগুলোকে সামান্য পরিবর্তন (tweak) করে প্রচুর ভ্যাকসিন বাজারে না ছাড়তে পারে তাহলে আমাদেরকে ২০২০ সালের প্যান্ডেমিকের অবস্থায় ফিরে যেতে হতে পারে। সে কারণেই ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে এক প্রকার আদা জল খেয়ে কাজে লেগে গিয়েছে। এখন সব কিছু নিশ্চিতভাবে জানার জন্যে – সপ্তাহ খানেকের অপেক্ষা আর প্রয়োজন মিডিয়ার দ্বায়িত্বশীলভাবে সংবাদ পরিবেশন করা। মনে রাখতে হবে pandemic ও Infodemic দুটোই ভয়ঙ্কর।
এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার বলছে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য তথ্যটি প্রকাশ করায় বৃটেন সহ অনেক দেশ তাদের ভাষায় খুব তড়িঘড়ি করে ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে শাস্তিমূলক আচরণ করেছে। প্রতিটি দেশের জনগণকে রক্ষা করা সে দেশের সরকারের দ্বায়িত্ব তবে একঘরে হওয়ার ভয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রকাশ করা থেকে পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যেন বিরত না থাকে এবং স্বচ্ছতার পরিচয় দেয় সেটাই আমাদের কাম্য। প্যান্ডেমিক নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে এই স্বচ্ছতাটুকুর খুব প্রয়োজন।
লেখক : Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA একজন চিকিৎসক, সংবাদ পাঠক ও কলামিস্ট।
Advertisement