লন্ডনের চিঠি: বিদেশের মাটিতে স্বদেশের ডিম-জুতার রাজনীতি

শারমিন জান্নাত ভুট্টো

সেই সময়টার কথা এখনও মনে আছে বেশ কয়েকটি কারণে। সম্ভবত সেটা ২০০০ সালের ২০ মার্চ। প্রথম কারণ, ওইদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন বিল ক্লিনটন।

ওইদিন ঢাকা শহরের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা কড়া রোদে রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানিয়েছিল এয়ারপোর্ট রোড থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পর্যন্ত। মহা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে অন্যান্য স্কুলের মতো আমাদের বটমলী হোম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও টানা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলো বিজয় সরণি মোড়ে।

ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে মনে মনে আমরাও ছিলাম বেশ খুশি। আর তার ওপর অভ্যর্থনা পর্ব শেষে আমরা আধা বেলাতেই ছুটি পেয়ে গিয়েছিলাম।

তবে আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণে দিনটির কথা মনে পড়লে এখনও ঘেমে উঠি।আর সেটা ছিলো বাড়ি ফেরার ঝক্কি। সেদিন বিজয় সরণির মোড় থেকে হেঁটে হেঁটে কুড়িল অবধি আসতে হয়েছিলো মোটামুটি তিন ঘণ্টা সময় পার করে।

অতিরিক্ত নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কিছু সময়ের জন্য পাবলিক পরিবহন চলাচল বন্ধ ছিলো। আর সে কারণেই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মাথার ওপর সূর্য মামাকে সঙ্গী করেই হাঁটা শুরু করেছিলাম বাড়ির উদ্দেশ্য। সাথে বন্ধুরা ছিলো বলে হয়তো সময়টা খুব একটা ঠাওর করতে পারিনি সেদিন।

এখন একটিবার ভাবুন তো, ঠিক ওই সময়টাতে যদি আমেরিকার কোনো বিরোধী দলের সমর্থকরা ক্লিনটন সাহেবকে অভ্যর্থনা জানানোর বিপরীতে তার জন্য ছেঁড়া জুতো আর ডিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তখন তা দেখে কিংবা সেই দৃশ্য কল্পনা করে আপনারই বা কেমন লাগতো? মনে মনে নিশ্চয়ই অনেকে ভাবতেন, কী অসভ্য দেশটির লোকজন!

প্রতিবাদ জানানোর থাকলে নিজ দেশে গিয়ে করুক, আমাদের দেশে এসে এসব করার কী দরকার- তা বলতেও দ্বিধা করতেন না অনেকেই। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে নানা ধরনের মত, মন্তব্য এবং চিন্তাধারা আমাদের মনে ঘুরপাক খেতে থাকবে। এমনকি এখনকার এ সময়ে এ ধরনের কোনো অঘটন ঘটলে তা টেলিভিশন আর পত্রিকায় রীতিমত ঝড় তুলতো, চলতো তার চুলচেরা বিশ্লেষণ।

তবে সে সুযোগ মার্কিনীরা বোধ করি অন্য আর কারো হাতে অতো সহজে তুলে দেবে না।তাদের যত ক্ষোভ-বিক্ষোভ, র‌্যালি, সমাবেশ, মহাসমাবেশ- সবই তাদের চিরচেনা গণ্ডিতে। আর এভাবেই তারা তাদের মতামতগুলো জানিয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী কোনো না কোনো শান্তিপূর্ণ আর অভিনব উপায়ে। তারা তাদের মতামত জানাতে যেমন পটু, তার থেকেও বেশি সচেষ্ট তাদের অধিকার আদায়ে।

তবে উন্নত বিশ্বের এ দেশগুলোতে থেকেও আমরা ‘শান্তিপূর্ণ আর অভিনব উপায়’ শব্দগুলোর অর্থে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছি। আর তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ খোদ বিলেতের মাটিতেই দেখতে পাচ্ছি।

বাংলাদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ-সংগঠন বেশ সক্রিয় ব্রিটেন এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে। জাতীয় দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের পাশাপাশি কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছন্দ পদচারণা লক্ষণীয়।

অবশ্য এর সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়। আর এ ভূমিকা খুবই অভিনব উপায়ে প্রয়োগের দেখা মেলে যখন দেশ থেকে বড় বড় নেতা-নেত্রীরা সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত সফরে বিলেত কিংবা ইউরোপের দেশগুলোতে যান।

কাউকে অভ্যর্থনা জানানো অবশ্যই একটি ভালো গুণ হওয়ার কথা। এমনকি দেশ থেকে আমাদের বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজন আসলে আমরাও তাদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর নয়তো হোটেল, যেখানে তারা অবস্থান করেন, সেখানে ছুটে যাই প্রাণের টানে, মায়ার তাগিদে। হয়তো একইভাবে এখানকার কর্মীরাও ছুটে যান তাদের নিজেদের দলের প্রধানকে স্বাগত জানাতে। তবে এখানে সামান্য একটু পার্থক্য রয়েছে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে। গত কয়েক বছর ধরে একটি অঘোষিত চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রবাসী নেতাকর্মীরা। আর সেটি হচ্ছে, কোনো দলের কোনো নেতা কনফারেন্স, সামিট কিংবা ব্যক্তিগত সফরে বিলেতে বা ইউরোপে আসলে অন্য দলের কর্মীরা ডিম, ছেঁড়া জুতো আর উচ্চ কণ্ঠস্বর, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফ্যাস্টুন নিয়ে হাজির হন।

বিমানবন্দর নয়তো হোটেলের সামনে তারা দিতে থাকেন একের পর এক স্লোগান। তবে বেশির ভাগ স্লোগান থাকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ভরপুর। আর এসব কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোনো দল বা দলপ্রধানকে হেয় আর হয়রানি করা। সেই সাথে স্বদেশে নিজ দলের কাছে নিজেদের উপস্থিতি এবং তথাকথিত কর্মকাণ্ডের জানান দেওয়া।

হিথ্রো বিমানবন্দর এমন একটি জায়গা, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দেখা মেলে। সেরকম একটি স্থানে গিয়ে হট্টগোল করে অন্যদের আমরা জানান দিচ্ছি যে দেশ হিসেবে আমাদের দেশের জনগণের আচার-ব্যবহার এমন উদ্ভট, যেখানে একজন অন্যজনকে অপমান আর অশ্রদ্ধা দেখাতে দ্বিধাবোধ করি না!

আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত ও চিন্তাধারা রয়েছে। প্রত্যকেই কোনো না কোনো আদর্শ ও মূল্যবোধে উজ্জীবিত। যুক্তি, তর্ক, আলোচনা, সম-আলোচনাই পারে কোনো বিষয়ে মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে কিংবা সেটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। তাই বলে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্যতম রাজনৈতিক দলের প্রধানরা বিদেশ সফরে আসলে প্রতিপক্ষ দলের কর্মীরা কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করে, আর সেটি দিনের পর দিন চর্চিত হয়ে কোনো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তা খুবই দুঃখজনক।

বিলেতের মূলধারার রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, জাতীয় কোনো ইস্যুতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একই কাতারে সামিল হয়ে কাজ করে। স্কটিশ রেফারেন্ডাম, ব্রেক্সিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডেমোক্রেটিক, লেবার অর্থাৎ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন ও জেরেমি করবিন একই সাথে কাজ করেছেন, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা একেবারেই অসম্ভব।

এমনকি নিজ দলের ভেতরে অন্তঃর্দলীয় কোন্দলের কারণে বিদেশের মাটিতে মারামারির ও ডিম ছোড়াছুড়ির ঘটনা খুবই স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে ।

গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিউ ইয়র্ক সফরের। সেখানে সভাস্থল ত্যাগ করার সাথে সাথেই শুরু হয়েছিলো নিজেদের মধ্যে মারামারি।

সবশেষে বলতে চাইবো, অন্য দলকে নীচু দেখাতে গিয়ে নিজ দেশের মুখশ্রীতে করাত চালানো হচ্ছে, তা যে একধরনের শিষ্টাচার বহির্ভূত রাজনীতি, তা জাতির কাণ্ডারীদের বোঝাবে কে? নিজের চাইতে দল বড়, আর দলের চাইতে দেশ বড়- এ কথাটি বোধহয় অনেকেই ভুলতে বসেছে, নয়তো উল্টোপথে হাঁটছে।

খুব বেশি দূরে নয়, যখন নেতাকর্মীরাও তাদের সিভিতে উল্লেখ করবেন- কে, কবে আর কোথায় অন্যদলের প্রধানকে ডিম নয়তো জুতো মেরেছিলেন! বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে পারলে ১০ পয়েন্ট আর জ্বালাময়ী স্লোগান দিতে পারলে বোনাস পয়েন্ট যোগ হবে আর বিবেচিত হবে এক্সট্রা কারিক্যুলাম এক্টিভিটিস হিসেবে।

এসব ‘যোগ্যতা’ নিকট বা অদূর ভবিষ্যতে কোনো না কোনো পদোন্নতি বগলদবা করতে ভূমিকা রাখবে। আর এমন ব্যবস্থার দেখা মিললে অবাক হওয়ার মতো কিছুই থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও নিউজ প্রেজেন্টার (ব্রিট বাংলার স্পেশাল কনট্রিবিউটর)

ই-মেইল: [email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement