আমাদের বঙ্গবন্ধু

:: ইসহাক কাজল ::

‘আমাদের’ এই শব্দের ওজন অনেক। অহরহ শব্দটি আমরা ব্যবহার করি বটে। বাস্তবিক যখনই শব্দটির গুরুত্ব অনুভব করি তখন আন্দাজে আসে ‘আমাদের’ বলে আসলে আমাদের খুব একটা বেশি কিছু নেই।

প্রতিটি বিষয়ই কারো কারো, প্রতিটি বিষয়ই অন্যের কিংবা প্রতিটি বিষয়ই একান্ত নিজের। একটা জাতিকে যদি বলা হয়, ‘আমাদের’ বলে সম্মিলিত ভাবে কোনো কিছুকে ভেবে নিতে তাহলে সেই জাতি কেবলমাত্র তার নিজস্ব ভূখন্ড ব্যতীত অন্য কিছুকে ‘আমাদের’ মর্যাদায় খুঁজে পায়না। জাতির জন্য আমাদের বলতে কেবলই রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সীমানা। সীমানার ভেতরে যে মানুষ বসবাস করে, সেই মানুষদের কাছে ‘আমাদের’ শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। ধরা যাক রাষ্ট্রনেতার কথাই, এক্ষেত্রে ‘আমার নেতা’, ‘আপনার নেতা’ কিংবা ‘ওদের নেতা’ পাওয়া যায় কিন্তু সর্বার্থে ‘আমাদের নেতা’ অভিধায় একক নেতার অস্তিত্ব বড় বিরল। কোনো কোনো জাতি অতি সৌভাগ্যক্রমে সেই ধরণের একজন নেতাকে পেয়ে যান। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নেতার সংখ্যা হাতেগোনা। বাঙালির সৌভাগ্য সেই হাতেগোনা নেতাদেরই একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

যাকে অক্লেশে আমাদের বঙ্গবন্ধু বলা যায়। বঙ্গবন্ধু কিভাবে আমাদের হয়ে উঠলেন? তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। আরো অনেক রাজনৈতিক দলের একটি। এবং আওয়ামী লীগে আরো অনেক নেতাও ছিলেন। মেধায়-প্রজ্ঞায় তাদের কাউকেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। তবুও সবাইকে ছাপিয়ে কেনো বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন গোটা একটা জাতির একক নেতা, কি সেই গোপন রহস্য, কি সেই জাদু? হ্যাঁ জাদুই বটে। একাত্তর কিংবা তার আগের সময়কাল যারা দেখেছেন তারা এক বাক্যে মানবেন বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিলো জাদুকরের মতো। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাদুকরও তাঁর জাদুর কাছে নস্যি হয়েছিলেন। রূপকথার সেই হ্যামোলিনের বংশিবাদক যেনো বঙ্গবন্ধুতে এসে প্রাণ খুঁজে পায়। বঙ্গবন্ধু বাঁশি বাজালেন, সেই বাঁশির সুর শুনে, মাঠ থেকে কৃষক, নদী থেকে জেলে, কলেজ থেকে ছাত্র, ঘর থেকে পুত্র, অফিস থেকে চাকুরিজীবি পথে নামলেন। সাত কোটি মানুষ সামিল হলো এক কাতারে। তারা ভুলে গেলো প্রতিপক্ষ ভীষণ শক্তিধর। তারা ভুলে গেলো, কেবলমাত্র সাহস ছাড়া অন্য কোনো রসদ তাদের নেই। সাহস দিয়েই কি দাঁড়ানো যায় মেশিনগানের বিপরীতে? শুধুমাত্র সাহসকে সঙ্গী করে এখন যদি কেউ মেশিনগানের সামনে বুক চিতরে দাঁড়ান, আমরা তাকে অবশ্যই বোকা বলে ব্যঙ্গ করবো। অথচ কী অনায়েসেই না একাত্তরে সেই প্রেক্ষাপট পাল্টে গিয়েছিলো। ট্র্যাংক, মেশিনগানের বিপরীতে মানুষ কী অসীম সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং সেটাকে মোটেও বোকামী বলে বোধ হলো না, মনে হলো সময়ের সেরা সিদ্ধান্ত হচ্ছে এটাই। মানুষের এমন সাহসে ভড়কে গেলো মরণাস্ত্র। অস্ত্রের প্রতিপক্ষ সাহস এবং সাহসের কাছে অস্ত্রের পরাজয়। এমন আশ্চর্য ব্যাপার একাত্তরেই কেবলমাত্র সম্ভবপর হয়েছিলো আর সেটিকে বাস্তব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি না থাকলে আমাদের এমন প্রেক্ষাপটে সাহসী হওয়ার সুযোগ ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর এমন আশ্চর্য ক্ষমতার নেপথ্যে কি ছিলো? একটু আগে তাকে জাদুকরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে তিনি তারও অধিক কিছু ছিলেন। হ্যামোলিনের বাঁশিওয়ালা বললেই বঙ্গবন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় না, তিনি তারও চাইতে বড়মাপের। বঙ্গবন্ধুর ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠার পেছনে ছিলো তার অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা। তিনি গোটা জাতির নাড়ির স্পন্দন টের পেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত চিকিৎসক। জাতির নাড়ির যন্ত্রণা তার মতো করে এতো ভালোভাবে পৃথিবীর সেরা স্নায়ূবিদের পক্ষেও ঠাহর করা সম্ভব ছিলো না। এই যে নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারা এটাই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের বঙ্গবন্ধুতে পরিণত করেছিল। একাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সাত কোটি মানুষের একক কণ্ঠস্বর। তিনি যা বলেছেন, সেটি সাত কোটি মানুষের ভাষা হয়েছে। তাতে দ্বিমত করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি (এই বাক্য শুনে অনেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবেন. তবে খেয়াল করলে দেখবেন এখানে কেবলই ‘মানুষের’ কথা বলা হচ্ছে)  বঙ্গবন্ধু যখন এই বিশাল ক্ষমতার অধিকারী, তখন কিন্তু আওয়ামী লীগে আরো অনেক বড়মাপের নেতা ছিলেন এবং তখন স্বয়ং মাওলানা ভাসানীও বেঁচে ছিলেন। তবে কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সেই সময়ে একক নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কেউ যদি একক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেন তবে তিনি সর্বগ্রাসীও হয়ে উঠেন। বিস্ময়কর রকম ভাবে বঙ্গবন্ধু এই দোষে দুষ্ট হননি। তার সময়েই কিন্তু তাজ উদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেইন মনসুর আলীসহ জাতীয় নেতারা ঠিকই আলো ছড়িয়েছেন। এমন কি তরুণ নেতৃত্বও যথারীতি বিকশিত হয়েছিলো। চার খলিফা খ্যাত সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজ যার যার অবস্থান থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনায় ছিলেন সফলতম। তাদের এই সফলতার পেছনে একটিই কারণ বিদ্যমান। তারা বলতেন, ‘আমরা কথা বলছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে’। ব্যস এই একটি কথাই স্বাধীনতার আন্দোলনে তাদেরও অমরতা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু এই তরুণ নেতাদের বিকাশে বাঁধা দেননি। বঙ্গবন্ধু কারো বিকাশেই বাঁধা দেননি। সবাই সবার অবস্থান থেকে একাত্তরে কাজ করেছেন। তাদের মাথায় ছাতা হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলেন। সেই সময়ে গোটা জাতির উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা এমনও ভাবতে লাগলেন, যদি বঙ্গবন্ধুর কিছু হয়ে যায়, তাহলে স্বাধীনতা দিয়ে কি হবে? এক্ষেত্রে ঐসব মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনায় স্বাধীনতার সমার্থক শব্দে পরিণত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুদ্ধ দিনের গল্প বঙ্গবন্ধুর জন্যে তুলে রাখলেন। যদি এই কথাটি কোনোদিন তারা বঙ্গবন্ধুকে বলার সুযোগ না পেতেন, সম্ভবত তাদের মুক্তিযুদ্ধ অপূর্ণ থেকে যেতো। সেই সময়ে যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশায় বঙ্গবন্ধু, তখন একজন সাধারণ পিতা যুদ্ধে যাওয়া তার সন্তানের চাইতে বেশি চিন্তিত থেকেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর খবর শোনার জন্যে সাত কোটি মানুষের হাপিত্যেশ সেটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু অবশ্যই রাজনৈতিক দলের নেতা। তিনি রাজনীতির মানুষ। চিরকাল রাজনীতি করেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের সীমাবদ্ধতা থাকে। তাকে নিজের দলের স্বার্থ দেখতে হয়। আওয়ামী লীগের স্বার্থ এবং সাত কোটি মানুষের স্বার্থ এক ছিলো না। ফলে এক্ষেত্রে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া অসম্ভব কিছু ছিলোনা। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তাই দুই পক্ষ থেকেই অপবাদ উঠার সুযোগ ছিলো, দলের কর্মীরা বলতে পারতেন, তিনি দলের চাইতে দলের বাইরের মানুষের মতামতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষ বলতে পারতেন, বঙ্গবন্ধু তার দলের স্বার্থ দেখছেন। কিন্তু কোনো পক্ষই এই কথাটি বলার সাহস পাননি অথবা বঙ্গবন্ধু কাউকেই এই সুযোগও দেননি। এটি করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বিশেষ কৌশলী হতে হয়নি। তাকে যা করতে হয়েছে, সেটি হলো নিজের স্পষ্ট অবস্থান স্থির করা। বলতে গেলে তার কারণেই আওয়ামী লীগ পরিণত হলো গণমানুষের সংগঠনে। আর যখন সেটি গণমানুষের সংগঠনে রূপ পায় তখন দলের স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থ এক হতে বিলম্ব ঘটেনি।  এইসব কিছুই সম্ভব হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে। তার ব্যক্তিত্ব মানুষকে এতোটাই মুগ্ধ করে রেখেছিলো এমন কি বঙ্গবন্ধু তিনি নিজের গায়ে হাতকাটা যে কোট চাপাতেন সেটিও স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রতীক পোশাকে পরিণত হলো। আজ এতদিন পরও মুজিব কোটের জনপ্রিয়তায় ঘাটতি আসেনি।

সবমিলিয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মকরণেই ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’। একটা জাতি একবারই পায় তাকে, তারপর আর পায় না কিছুতেই। তাই তো এখনো বাংলাদেশ তথা বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেক বাঙালির কণ্ঠে সমস্বরে উচ্চারিত হয় বাঙালির শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তাই আমার স্বগত উচ্চারণ, আমি শেখ মুজিব তুমিও শেখ মুজিব দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা  আমরা প্রতিটি বাঙালি শেখ মুজিব আমাদের পরিচয়-প্রযতেœ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ইসহাক কাজল : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী।  লন্ডন, ১২ আগস্ট ২০১৭

Advertisement