আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান!

: নজরুল ইসলাম :

নেশা!এযেনো রবীন্দ্রনাথের “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান !

আমার মায়ের কাছ থেকে শুনা একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার গল্প দিয়েই আজকের সচতেনতামূলক মতামত আর্টিকেলটি সূচনা করতে চাচ্ছি মতলব, আপনাদের সাথে একটি সামাজিক ব্যাধি নিয়ে একটু মাতব্বরি করার পায়তারা।

সেদিন আমি ছিলাম ছোট শিশু, মায়ের কাছ থেকে শুনা যে গল্পটি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি সেটি শুনে আমি হেসেছি, পাশাপাশি বিষয়টি আমাকে একটু ভাবিয়েছেও!

গল্পঃ আমার বাবা একজন শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী, উনাকে অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় বলতে পারেন-দ্যা ম্যান উইথ মাল্টিটাস্ক Multi Task, অনেকদিন পূর্বে আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। হাঁটা শিখার পর থেকেই বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আমার বাবা তখন একটু একটু সিগারেট খেতেন। একদিন আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে স্থানীয় একটি দোকান থেকে উনার জন্য সিগারেট আনতে পাঠিয়েছিলেন। আমিতো মহানন্দে দৌড়ে দৌড়ে সিগারেট প্যাকটি নিয়ে এসে আমার মায়ের সামনেই বাবার হাতে দিলাম। এই তো শুরু- আমার মা প্রাথমিকভাবে বাবার সাথে ঝগড়া শুরু করলেও পরবর্তীতে ঠান্ডা মাথায় উনাকে কয়েকটি প্রশ্নও ছুড়েছেন যার একটি–* আমার কচি বাচ্চাকে দিয়ে সিগারেট কিনতে পাঠানো কি আপনার ঠিক হয়েছে? মা বলেছেন বাবা কোনো প্রশ্নেরই সু-উত্তর দিতে পারেননি। তাৎক্ষণিক আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং উনাকে প্রতিশ্রূতি দিয়েছেন এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবে না। যদিও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মা-বাবার সাথে এক সপ্তাহ কথা বলেননি।

আমরা মনের অজান্তে অনেক ভুলত্রুটি করি যার সঠিক সমাধান হল, যদি কেউ তা শুধরিয়ে দেয় কুতর্কে লিপ্ত না হয়ে অপকটে স্বীকার করে নেওয়া। কু-তর্কে তো আবার আমরা সমানের গ্যালারিতে। আমার বাবার অপ্রত্যাশিত ত্রুটি উনাকে একজন আদর্শ পিতার শিরোনাম থেকে মুচে ফেলতে পারেনি–সেই দিন থেকেই তিনি সিগারেট করা বন্ধ করে দিয়েছেন আজওবদি। তিনি একজন আদর্শ পিতার এক্সামপল, একজন আদর্শ শিক্ষক, ছিলেন শিক্ষক সমাজের নেতা- শিক্ষানুরাগী। পরিবারে আমরা সকলই সু-শিক্ষায় শিক্ষিত ও মানবীয় গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হওয়ার চেষ্টাতে–তিনিই হচ্ছেন আমাদের রোল মডেল।

মনে হচ্ছে বিষয়বস্তু থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আজকাল বিষয়বস্তু ঠিক রেখে আলোচনা করা বড়ই কঠিন। অনেকটা সেই রূপ কথার মত- “আমি কৈ কি আর আমার সারিন্দা কয় কি? কিন্তু, ছন্দে ছন্দে পরনিন্দা পরসমালোচনা করতে পারি যা আমাদের আনন্দ দেয় ড্রাগের মত।

একটু কর্ণপাত করলে দেখবেন -বলা আর বোঝার মধ্যে ফারাকের কোনো কূলকিনারা নেই। সবাইকে একই নৌকায় চড়ানো বা একই পাতায় বসানো খুবই কঠিন কাজ। মনে হয় যে বলেন আর যিনি শোনেন দুজনের কান ও মগজ এক নয়। ফলে একরকম বললেও দুজনে দু’রকম শোনেন! বিরাট সমস্যা! উত্তরণের জন্য প্রয়োজন চোখ বুঝে একটু বসা-শ্বাস ইন–ভিতরে নেওয়া, প্রশ্বাস আউট -বাহিরে ফেলা।

ঠান্ডা মাথায় নিজে নিজেরে প্রশ্ন করা আর মানবিক মূল্যবোধ নীতি নৈতিকতাকে সামনে রেখে উত্তর খুঁজে বের করা, ভেরি সিম্পল!

আমার মনে পড়ে আমি তখন কলেজ স্টুডেন্ট ছিলাম একটি বিশেষ এলাকার যুবসমাজকে নিয়ে সামাজিক ব্যানার ‘ড্রাগ কন্ট্রোল এসোসিয়েশন মৌলভীবাজার, সংগঠন করেছিলাম’।

আমরা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে সচেতনতা মূলক প্রচার-প্রচারণা ও এর ক্ষতিকারক দিকগুলো লিফলেট আকারে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি করতে সহায়তা করেছি। মজুরি শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ধারণা দিয়ে সহায়তা করেছি যে সিগারেটে নিকোটিন কিভাবে আমাদের দিনে দুপুরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সিগারেট নিচ্ছেন আপনি ক্ষতি করছেন আপনার নিজের, পরিবারের সকল সদস্যের, এমন কি জম্ম হয়নি আপনার সন্তান সম্ভবা স্ত্রীর পেটের বাচ্চাটিরও।

যারা সিগারেট খান অনেকেই সেইদিন আমাদের প্রতিশ্রূতি দিয়েছিলেন আর সিগারেট খাবেন না। প্রাইমারি স্কুলে হাইস্কুলে প্রতিবছর আমরা ছাত্র-ছাত্রী সামাজিক সংগঠক ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি করাই ছিল আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। যতটুকু সম্ভব আমরা করেছি, এখনো করছি, আমাদের সকলের করা উচিত- অনেকেই করছেন।

যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার পূর্বে ঐ বিষয় সম্পর্কে আপনার ন্যূনতম ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়। ধারণা না থাকলে বিষয়টি নিয়ে স্টাডি প্রয়োজন একটু জেনে নেওয়া ভাল আলোচনার স্বার্থে। তত্ব ভিত্তি যুক্তিযুক্ত accurate আলোচনা পাঠকের পাশাপাশি নিজেকে সমৃদ্ধ করবে। আপনাদের বিরক্তির কারণ হওয়ার পূর্বেই এই সামাজিক ব্যাধি মাদকদ্রব্য ইহার কারণ লক্ষণ এবং কি ভাবে এর থেকে উত্তরণ একটু আলোচনা করেই শেষ করতে চাই।

গবেষক, চিকিৎসক মাদকদ্রব্য ও নেশার আসক্তির যে কারণগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন সেগুলো হল বেকারত্ব, স্কুল কলেজে পড়াকালীন সময় একজন ছাত্র যখন দেখে যে তার অন্য বন্ধুটি নেশা করে, একে অন্যকে নেশার জগতে আসার জন্য অনুরোধ করে উৎসাহ যোগানো, অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে যারা তার অপর বন্ধুকে জোর পূর্বক নেশা করায়, বল বীর চির উন্নত মম শির ঐ যে যৌবনের বিদ্রোহী মনোভাব, অঞ্চল ভেদে মাদকের প্রভাব লক্ষনীয়, ধর্মীয় অনুভূতি জ্ঞান জিরো, মাদকের সহজলভ্যতা, জীবনের প্রতি আস্থাহীনতা, অর্থের অভাবে অনেক সময় যুবকরা মাস্তানি, চুরি, ছিনতাই রাহাজানি ডাকাতি অপহরণ মুক্তিপণ আদায় থেকে শুরু করে খুন খারাবি করে যাদেরকে খুব সহজেই মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে, বিদেশি সংস্কৃতি অনুসরণ করার ফলে মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির কথা ভুলে গিয়ে, সমঝোতার অভাব, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শিথিল সম্পর্ক, এবং হতাশার কারণে মানুষ মাদকের প্রতি আসক্ত হওয়ার আরেকটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

আমি ম্যানেজমেন্টের ছাত্র ছিলাম, অনার্স ডিগ্রিতে সাইকোলজি ছিল আমার সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট। আচরণের কারণ তত্ব পড়েছিলাম It was really Interesting মনে পড়ছে। কেন, মানুষের আচরণ পরিবর্তন হয়? পরিবারের কোনো সদস্য মাদকদ্রব্য গ্রহণ শুরু করছে কি না তা বোঝার জন্য কতগুলো আচরণগত পরিবর্তন লক্ষনীয়-একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে-যেমন হঠাৎ করেই কারো স্বাভাবিক আচরনে পরিবর্তন আসতে পারে, অন্যমনস্ক থাকা, একা থাকতে পছন্দ করা, অস্থিরতা প্রকাশ, চিৎকার, চেঁচামেচি করা, অসময়ে ঘুমানো ঝিমানো হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, কারণে-অকারণে খারাপ ব্যবহার করা এবং ও অস্পষ্ট কথাবার্তা বলা, কার সঙ্গে কোথায় যায় এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিরক্ত হওয়া, গোপন করা কিংবা মিথ্যা বলা, ঘর অন্ধকার করে জোরে মিউজিক শোনা, নির্জন স্থানে বিশেষত বাথরুম বা টয়লেটে আগের চেয়ে বেশি সময় কাটানো, রাত করে বাড়ি ফেরা, রাতে ঘুম নেই দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, হঠাৎ নতুন অপরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করা, বিভিন্ন অজুহাতে ঘন ঘন টাকা-পয়সা চাওয়া, স্বাভাবিক খাবার-দাওয়া কমিয়ে দেওয়া, অভিভাবক এবং পরিচিতদের এড়িয়ে চলা, স্বাভাবিক বিনোদন মাধ্যমের ক্রমশ আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রমাগত টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে মিথ্যা কথা বলে ঋণ করা ইত্যাদি।

এছাড়াও চোরাচালান মাদকদ্রব্য প্রচার প্রসারে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে আমাদের দেশের নীতি নির্ধারক প্রশাসনের যথাযথ কর্তা-ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা এখনো প্রশ্নাতীত। একজন মাদকাসক্তকে একদিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে বা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তাদের আইনের আওতা থেকে রের করে নিয়ে আসছেন। যার ফলে মাদকাসক্তরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে মাদকদ্রব্য প্রচার প্রসারে নিজেদেরকে দক্ষতার সহিত সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আপনার প্রতিবেশী, আত্বীয়-স্বজন পরিবারের সদস্য নিকটজন উল্লেখিত সমস্যা মোকাবেলা করছেন আপনার আমার দায়িত্ব কি? আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সাহায্য করা appropriate way, তাদের প্রয়োজন আপনার আমার সাপোর্ট সঠিক দিক নির্দেশনা কারণ তারা বিপদগ্রস্ত।

আপনার ছেলে নেশার রাজ্যে হারিয়ে গেছে তাকে ধরে বেঁধে মারধর করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

এগুলো পুরোনো টেকনিক এই সময়ে তো আর কাজ করবে না। সভ্যতার প্রথম থেকেই ড্রাগস আবিষ্কার হয়েছিল মানুষের কল্যানের জন্য।

বিশেষ করে নেশা জাতীয় ড্রাগস সমূহ সিংহভাগই ব্যবহার করা হয় তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্যই যা আজো হেল্থ সার্ভিসে ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু কিছু বিপথগামী ও অর্থ লোভীরা একে ধংসাত্মক কাজে ব্যবহার করে সমাজ দেশ তথা আমাদের যুব সমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

মাদকাসক্তি এমন এক নেশা যার মধ্যে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরিত্যাগ করা বড়ই কঠিন।

মাদক কিভাবে মানুষকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় সে নিজে জানে না, বুঝতে পারে না এবং অপরকে বুঝতে দেয় না। তাই মাদকের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে বাঁচতে এর কুফল সম্পর্কে জানতে হবে জানাতে হবে অপরকে, বাড়াতে হবে সামাজিক সচেতনতা।

মেডিটেশন বিভিন্ন সময়ে আমাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি করতে সাহায্য করে। ড্রাগ অ্যাডিকশন ছাড়ার সময়ে মানসিক দিক থেকে মাদকাসক্তরা দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়। তাই মেডিটেশন করে অনেকটা স্বাভাবিক থাকতে পারবেন। মেডিটেশনের মাধ্যমে আপনার নেগেটিভ চিন্তাধারা দূর হবে এবং আপনি আপনার জীবন নিয়ে সুন্দর ভাবতে পারবেন। মেডিটেশন আপনাকে কাজে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক, দেহের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, মনের হতাশা ও অশান্তি দূর করে। ঘুমাতে সহায়তা করে, মনোকষ্ট দূর হয়, চিন্তা শক্তির প্রখরতা বাড়ে, মানসিক চাপ কমায় আবেগ, অভিমান দূর হয়।

ইংরেজীতে একটি কথা আছে prevention is better than cure রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। মাদক নিয়ন্ত্রণের বেলায় ও এই নীতি অনুসরণ করে মাদকাসক্তের সংখ্যা অনেকটা নির্মূল করা সম্ভব। মাদকাসক্তদের বেশিরভাগই যুব সমাজ যাদের শিক্ষা জীবনে প্রত্যাশা ছিল লেখাপড়া শেষ করে কর্মের মাধ্যমে পরিবার সমাজ জাতির সেবা করবে, কিন্তু বাস্তব ভিন্ন চিত্র। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে শিক্ষিত বেকারদের। মাদকাসক্তি যেহেতু সামাজিক ব্যাধি তাই এ সমস্যা সমাধানের উপায় ও সমাজকে বের করতে হবে।

এজন্য সামাজিকভাবে মাদক ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে। দেখেন, পৃথিবীতে সমস্যা বলতে কিছু নেই। কারণ প্রতিটি সমস্যারই একটা সমাধান রয়েছে। সামাজিক ব্যাধি মাদকেরও সমাধান রয়েছে। সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে যা পৌঁছে দিতে হবে সমাজের সকল স্তরে। এক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আসুন একটি সুন্দর সমাজ দেশ ও জাতি গঠনে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রচার রোধে ও এর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি।

নজরুল ইসলাম
ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস লন্ডন,
মেম্বার, দি ন্যাশনাল অটিষ্টিক সোসাইটি ইউনাইটেড কিংডম
আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন।
trade.zoon@yahoo.com

Advertisement